ছন্দ কাব্যের গতিসৌন্দর্য সৃষ্টির প্রধান উপাদান। হাজার বছরের বাংলা কাব্যে কবিরা আবেগ, ভাব ও নান্দনিকতা প্রকাশের জন্য নানা ছন্দ নির্মাণ ও বিকাশ ঘটিয়েছেন। ভারতবর্ষে ছন্দচর্চার সূচনা বৈদিক যুগে; বাল্মীকির অনুষ্টুপ্ ছন্দকে আদি ছন্দ বলা হয়। সংস্কৃত ছন্দের ধারাই পরবর্তীকালে বাংলা ছন্দের ভিত্তি গড়ে তোলে, যদিও বাংলা ছন্দের বিকাশে কবিদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলা কাব্যের ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার— মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত। চর্যাপদ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই তিন ছন্দই বাংলা কাব্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ছন্দ। এটি মাত্রার উপর নির্ভরশীল এবং চর্যাপদে এর প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। বৈষ্ণব পদাবলিতে এর পরিণত ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহার লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে অক্ষরবৃত্তের প্রভাব থেকে মুক্ত করে এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেন—এটাই তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান।
স্বরবৃত্ত ছন্দ বাংলা ভাষার ধ্বনিগত স্বভাবের সঙ্গে সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ। এটি শ্বাসাঘাতপ্রধান, দ্রুত ও প্রাণবন্ত। লোকগান, বাউল, পাঁচালি, শ্যামাসঙ্গীত ও আধুনিক ছড়ায় এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ধামালি ছন্দকে স্বরবৃত্তের প্রাচীন রূপ হিসেবে ধরা হয়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বাংলা কাব্যের প্রধান ও সর্বাধিক ব্যবহৃত ছন্দ। এটি তানপ্রধান ও গদ্যঘনিষ্ঠ। মধ্যযুগে পয়ার ছন্দের মাধ্যমে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়, বিশেষত রামায়ণ, মহাভারত ও মঙ্গলকাব্যে। পয়ার ছন্দের বিভিন্ন রূপ—মহাপয়ার, ভঙ্গপয়ার, তরল পয়ার ইত্যাদি—ক্রমে বিকশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মাধ্যমে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে আধুনিক গতি আনেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ছন্দের আধুনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের সৃষ্টিশীল পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা ছন্দ আরও বিজ্ঞানসম্মত, প্রাণবন্ত ও ভাবপ্রকাশে সক্ষম হয়ে উঠেছে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more